বিশেষ প্রতিনিধি ঃদেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলার ভৌগোলিক অবস্থান আর দশটি জেলা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মেঘনা আর তেঁতুলিয়া নদী বেষ্টিত এই জেলার সাথে মূল ভূখণ্ডের কোনো সড়ক সংযোগ নেই। ফলে, জেলাটিতে যদি কোনো মানুষের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (Brain Stroke), হৃদরোগ (Heart Attack), প্রসবকালীন জটিলতা কিংবা কোনো সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হওয়ার মতো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বরিশাল বা ঢাকায় স্থানান্তরের একমাত্র উপায় হচ্ছে নদীপথ।
বাস্তবতা কতটা নির্মম, তা একজন মুমূর্ষু রোগীর ঢাকা বা বরিশালে যাওয়ার যাত্রাপথের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনো রোগী স্ট্রোক বা দুর্ঘটনার শিকার হলে প্রথমে তাকে ভোলা সদর হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর কর্তব্যরত চিকিৎসক যখন তাকে ঢাকা বা বরিশালে রেফার করেন, তখন থেকে শুরু হয় এক চরম অনিশ্চিত ও যন্ত্রণাদায়ক যুদ্ধ।
সদর হাসপাতাল থেকে রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ভোলার ভেদুরিয়া ফেরিঘাট বা ইলিশা ঘাটে নিয়ে যেতেই বেশ কিছু সময় চলে যায়। এরপর নদী পারাপারের পালা। ঘাটে পৌঁছানোর পর যদি একটি ফেরি পাওয়া যায়, তবে বরিশালের লাহারহাট কিংবা লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর হাট পৌঁছাতে ফেরিতে সময় লাগে গড়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। লঞ্চে লাগে দেড় ঘণ্টা, আর চরম ঝুঁকিপূর্ণ স্পিডবোটে লাগে ৪৫ মিনিট। কিন্তু সংকট এখানেই শেষ নয়; এই নদীপথ পাড়ি দেওয়ার পর ওপাড়ে নদীঘাট থেকে রোগীকে আবার নামিয়ে, আরেকটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে ঢাকার যেকোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে পৌঁছাতে ন্যূনতম আরও ৫ ঘণ্টা সময় লেগে যায়।
একবার ভাবুন, একজন সংকটাপন্ন রোগীকে এই দীর্ঘ যাত্রাপথে বারবার অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে নৌযানে, আবার নৌযান থেকে নামিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে স্থানান্তর করতে হয়। এই ওঠানো-নামানোর শারীরিক ধকল এবং ঘাটে ঘাটে অপেক্ষার মানসিক যন্ত্রণা একটা সুস্থ মানুষকেও অসুস্থ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর একজন মুমূর্ষু রোগীর ক্ষেত্রে? চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে মূল্যবান সময় বলা হয়, এই বারবার স্থানান্তর এবং নদীপথের দীর্ঘসূত্রিতায় সেই মহামূল্যবান সময়টুকু পথেই হারিয়ে যায়। ফলে, অনেক রোগী মাঝনদীতে বা অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আর যারা কোনোমতে হাসপাতালে পৌঁছান, ততক্ষণে তাদের শারীরিক অবস্থার এতটাই অবনতি ঘটে যে চিকিৎসকদের আর কিছুই করার থাকে না।
এখানে একটি সহজ অর্থনৈতিক ও সময়ের তুলনামূলক সমীকরণ বিবেচনা করা প্রয়োজন। ভোলার সাথে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ স্থাপনের জন্য একটি মেগা সেতু নির্মাণ করতে সরকারের কয়েক হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন, যা দীর্ঘমেয়াদী এবং বিশাল বাজেটের বিষয়। অন্যদিকে, ভোলাতেই যদি ঢাকার মতো একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গড়ে তুলতে হয়—যেখানে নিউরোসার্জন, কার্ডিয়াক সার্জন, কিংবা থোরাসিক সার্জনদের সমন্বয়ে জটিল ও সমন্বিত অস্ত্রোপচারের আধুনিক সুবিধা থাকবে, তবে তেমন অবকাঠামো তৈরি এবং দক্ষ জনবল পদায়ন করতেও শত শত কোটি টাকা এবং বহু বছরের দীর্ঘসূত্রিতার প্রয়োজন।
কিন্তু মানুষের জীবন তো আর এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করবে না। সেই তুলনায়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB) কিংবা উপযুক্ত বেসরকারি এভিয়েশন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ভোলার জন্য একটি বা দুটি ডেডিকেটেড হেলিকপ্টার অ্যাম্বুলেন্স সার্বক্ষণিক প্রস্তুত (Standby) রাখার প্রাথমিক ও পরিচালন ব্যয় (Operational Cost) অত্যন্ত নগণ্য। কয়েক হাজার কোটি টাকার মেগা প্রজেক্টের তুলনায় মাত্র কয়েক কোটি টাকার এই জীবন রক্ষাকারী উদ্যোগটি অর্থনৈতিকভাবে যেমন সাশ্রয়ী, তেমনি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর। ভোলার ২০ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচানোর যে মানবিক মূল্য, তার কাছে এই পরিচালন ব্যয় কিছুই না। যে পথ পাড়ি দিতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় এবং অমানুষিক ধকল সহ্য করতে হয়, হেলিকপ্টারের মাধ্যমে মাত্র ১ থেকে ১.৫ ঘণ্টার মধ্যে রোগীকে সম্পূর্ণ নিরাপদে ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
তবে এই সেবাটি চালুর ক্ষেত্রে জরুরি মুহূর্তে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে কীভাবে দ্রুত রোগী পাঠানো যাবে এবং এর খরচ কে বহন করবে, তার একটি বাস্তবসম্মত ও স্বচ্ছ রূপরেখা থাকা প্রয়োজন:
১. আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত দ্রুত সুপারিশ ও অনুমোদন:
অন-ডিউটি কনসালট্যান্ট/মেডিকেল অফিসার: ভোলা সদর হাসপাতালে রোগীকে আনার পর যিনি তাকে দেখছেন, তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারিত ফর্ম বা ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে “এয়ার ইভাকুয়েশন” (Air Evacuation)-এর সুপারিশ করবেন।
তত্ত্বাবধায়ক/সিভিল সার্জন: সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বা জেলার সিভিল সার্জন এই সুপারিশের ভিত্তিতে একটি ডেডিকেটেড হটলাইন বা ওয়ান-স্টপ কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিটের মধ্যে হেলিকপ্টার ওড়ানোর চূড়ান্ত অনুমোদন (Clearance) দেবেন, যাতে কোনো দীর্ঘ ফাইলিংয়ের পেছনে সময় নষ্ট না হয়।
২. স্বচ্ছ ও টেকসই অর্থায়ন (ট্রিয়াজ ও ফাইন্যান্সিয়াল মডেল):
সেবাটি যাতে অপব্যবহার না হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে, সেজন্য তিনটি স্তরে খরচ নির্ধারণ করা যেতে পারে:
সম্পূর্ণ সরকারি (বিনামূল্যে): অসচ্ছল, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতাভুক্ত পরিবার অথবা এমন কোনো সড়ক দুর্ঘটনার শিকার রোগী—যার তাৎক্ষণিক টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে (বা দুর্যোগ তহবিল থেকে) এই সেবা দেওয়া হবে।
আংশিক ভর্তুকি (Subsidized Rate): মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সরকার নির্ধারিত একটি সর্বনিম্ন ভাড়া (যেমন: ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা) নির্ধারণ করা যেতে পারে, বাকি খরচ সরকারি খাত থেকে ভর্তুকি দেওয়া হবে।
বাণিজ্যিক বা পূর্ণাঙ্গ রেট: বিত্তবান ব্যক্তিরা যদি সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে এই ডেডিকেটেড সেবাটি নিতে চান, তবে তারা কমার্শিয়াল রেটে টাকা পরিশোধ করবেন, যা এই প্রজেক্টের নিজস্ব ফান্ড বা তহবিল গঠনে এবং সেবাটি সচল রাখতে সাহায্য করবে।
ভোলার ২০ লক্ষ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে, ভৌগোলিক কারণে সৃষ্ট এই বৈষম্য দূর করতে এবং অকাল মৃত্যু রোধে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে এই সুনির্দিষ্ট, সাশ্রয়ী ও কার্যকর প্রস্তাবনাটি বিবেচনা করবেন—এটাই ভোলাবাসীর প্রত্যাশা।
ভোলা নিউজ / টিপু সুলতান
মন্তব্য করুন