বিশেষ প্রতিনিধি,ভোলা: সামান্য ঝড়-বৃষ্টি কিংবা দমকা হাওয়া হলেই যেন ভোলার পল্লী বিদ্যুতের ‘মরণদশা’ তৈরি হয়। সমপ্রতি ঈদুল আজহার আনন্দের মাঝেই তীব্র গরম আর কয়েক দফা কালবৈশাখী ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে ভোলা সদর উপজেলার বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা। ঝোড়ো বাতাসে গাছপালা ভেঙে পড়ে বিভিন্ন স্থানে তার ছিঁড়ে যাওয়ায় টানা তিন দিন সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন ছিল বুড়ার একমাত্র বন্দর নগরী ইলিশাসহ ভোলার বিস্তীর্ণ এলাকা।
তীব্র গরমে জনজীবন যখন বিপর্যস্ত, ঠিক তখনই পল্লী বিদ্যুতের এই চরম ব্যর্থতায় ভোলার হাজার হাজার পরিবারের ঈদের আনন্দ রূপ নিয়েছে বিষাদে। বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে রাখা কোরবানির বিপুল পরিমাণ মাংস পচে নষ্ট হয়ে গেছে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুতের ধীরগতির রেসপন্স এবং চরম জনবল সংকটের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের। কোটি কোটি টাকার পচনশীল খাদ্য ও মাংস পচে যাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
ক্ষোভ ও দুর্ভোগের চিত্র:
সরেজমিনে ভোলার ইলিশা ইউনিয়নসহ সদর উপজেলার বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে গ্রাহকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঈদের ছুটির অজুহাত দিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ মাঠপর্যায়ে সংস্কার কাজে চরম উদাসীনতা দেখিয়েছে। ঝড় থামার দীর্ঘ সময় পর অল্প কিছু জনবল নিয়ে তারা কাজ শুরু করলেও দীর্ঘ ৭২ ঘণ্টায়ও অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ সচল করতে পারেনি।
ইলিশা ইউনিয়নের কয়েকজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কষ্টের টাকায় কোরবানি দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ফ্রিজে রেখে মাংসগুলো দীর্ঘদিন খাব, কিছু গরিব মানুষকে দেব। কিন্তু টানা তিন দিন কারেন্ট না থাকায় ফ্রিজের সব মাংস পচে দুর্গন্ধ বের হয়ে গেছে। সব মাটিতে পুঁতে ফেলতে হয়েছে। এই লোকসানের দায় এখন কে নেবে?”
গ্রাহকদের দাবি, শুধু এই ঈদ নয়, সারা বছরই সামান্য বাতাস বা বৃষ্টি হলেই পল্লী বিদ্যুৎ সুরক্ষার অজুহাতে লাইন বন্ধ করে দেয়। উপকূলীয় জেলা হওয়ায় এখানে ঝড়-তুফানের তীব্রতা বেশি, অথচ বছরের পর বছর ধরে এখানে সেই প্রাচীন আমলের খুঁটি আর খোলা তারের (ওভারহেড) মাধ্যমে বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে। ফলে গাছের ডালপালা পড়লেই লাইন ট্রিপ করে অথবা তার ছিঁড়ে দিনের পর দিন বিদ্যুৎ বন্ধ থাকে।
জনগণের দাবি: স্থায়ী সমাধান “আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবলিং”
এই দীর্ঘস্থায়ী ও পুঞ্জীভূত দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে এখন ভোলার সচেতন মহল ও সাধারণ জনগণ ঐতিহ্যবাহী ওভারহেড লাইনের পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে “আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবলিং” (ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ লাইন) ব্যবস্থার দাবি তুলছেন।
এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ভোলার সার্বিক উন্নয়নের রূপকার ও ভোলা-১ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের মতে, ভোলা সদরকে পল্লী বিদ্যুতের এই অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (REB), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (RHD)-এর মধ্যে একটি যৌথ সমন্বয় প্রয়োজন। বর্তমানে ভোলা সদরে এলজিইডি ও সওজ-এর যেসব রাস্তা উঁচু ও সংস্কার করা হচ্ছে কিংবা ভবিষ্যতে যেসব নতুন রাস্তা হবে, সেগুলো নির্মাণের সময়ই রাস্তার পাশ দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড বিদ্যুৎ লাইনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘ইউটিলিটি ডাক্ট’ বা পাইপলাইন বসানো হোক।
ভূগর্ভস্থ লাইনের সুফল ও সরকারের লাভ:
প্রতিবেদনে দেখা যায়, আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবলিংয়ের প্রাথমিক খরচ কিছুটা বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি অত্যন্ত লাভজনক। এর প্রধান সুবিধাগুলো হলো:
১. দুর্যোগেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ: মাটির নিচে লাইন থাকলে কালবৈশাখী বা ঘূর্ণিঝড়েও তার ছিঁড়বে না। দুর্যোগ শেষ হওয়ামাত্রই মানুষ বিদ্যুৎ পাবে।
২. রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হ্রাস: প্রতি বছর ঝড়-বৃষ্টির পর তার জোড়া দেওয়া, খুঁটি সোজা করা এবং নিয়মিত গাছের ডাল কাটার পেছনে পল্লী বিদ্যুতের যে কোটি কোটি টাকা ও জনবল অপচয় হয়, তা সম্পূর্ণ বেঁচে যাবে।
৩. খাদ্য ও অর্থের নিরাপত্তা: ফ্রিজ ও কোল্ড স্টোরেজগুলো সচল থাকায় ভবিষ্যতে আর কখনো সাধারণ মানুষের মাংস বা কৃষকের পচনশীল পণ্য পচে আর্থিক ক্ষতি হবে না।
৪. সিস্টেম লস ও চুরি রোধ: মাটির নিচের তার থেকে অবৈধ হুকিং বা বিদ্যুৎ চুরি অসম্ভব হওয়ায় সরকারের রাজস্ব ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে।
এমপি আন্দালিব রহমান পার্থর প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা:
ভোলা নিউজ ডট কম-এর মাধ্যমে ইলিশা ইউনিয়নসহ ভোলা সদরের সর্বস্তরের জনগণ তাদের প্রিয় নেতা সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থর কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন, তিনি যেন ভোলার মানুষের এই চিরস্থায়ী কষ্ট দূর করতে এই ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবলিং’ প্রকল্পটিকে একটি ‘পাইলট প্রজেক্ট’ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং জাতীয় সংসদ ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে এটি বাস্তবায়নের জোর দাবি তোলেন।
ভোলার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, “স্মার্ট বাংলাদেশ” ও “আমার গ্রাম, আমার শহর” রূপকল্পের অংশ হিসেবে ভোলা সদর উপজেলাকে একটি মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে এই সমন্বিত টেকসই অবকাঠামোগত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।
ভোলা নিউজ / টিপু সুলতান
মন্তব্য করুন