ভেজাল দেয়ার দরকারটা কী: প্রধানমন্ত্রী

ডেস্কঃ ভোলানিউজ.কম,

১৯জুলাই-২০১৭ইং,

অতি মুনাফার আশায় খাদ্যে ভেজাল দিলে আখেরে ব্যবসার ক্ষতি হয় বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এতে দেশেরও সুনাম নষ্ট হয়। বিদেশেও দেশের বাজারের ক্ষতি হয়।

বুধবার জাতীয় মৎস্য সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় বক্তব্য রাখার সময় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মৎস্য খাতে অবদান রাখায় ১৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পুরষ্কৃত করা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী মাছ উৎপাদন বৃদ্ধিতে গবেষণা, প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানির ওপর জোর দেন। গুরুত্ব দেন সততার ওপর।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এখানে ভেজাল দেয়ার একটা প্রবণতা আছে। দরকারটা কী? এই ভেজাল দিয়ে বেশি মুনাফা করতে গিয়ে নিজের ব্যবসারও সর্বনাশ, দেশেরও সর্বনাশ। এই সর্বনাশের পথে যেন কেউ না যায়। বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত এবং চাষের সাথে যারা জড়িত, তাদেরকে আমি অনুরোধ করবো, ব্যবসাটাও নষ্ট করবেন না, আর দেশের পণ্যটাও আপনারা নষ্ট করবেন না।’

চিংড়িতে ভেজাল দেয়ার চেষ্টায় ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘৯৬ সালে যখন আমি সরকারে আসি, দেখলাম, চিংড়ি রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। ইউরোপ আমাদের কাছ থেকে আর চিংড়ি নেবে না। তখন এক ভদ্রলোক ছিলেন, তিনি ভাল রাজনৈতিক নেতাও হয়ে গিয়েছিলেন। এক সময় আমাদের পার্টি, আরেক সময় আরেক পার্টি, এভাবে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি চিংড়ি মাছের ভেতর লোহা ঢুকিয়ে দিয়ে ওজন বৃদ্ধি করে রপ্তানি করতে যাচ্ছিলেন। সেটা যখনই ধরা পড়ে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে চিংড়ি রপ্তানি বন্ধ। আমরা কেবলই তখন সরকারে এসেছি। তখন আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কথা বলি।’

‘মাছের ক্ষেত্রগুলো, অর্থাৎ মাছের হ্যাচারিগুলো খুব অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় ছিল। সে সময় ৪০ কোটি টাকা তাদেরকে আমরা দেই। সে সময় এটা বিশাল একটা অংক। টাকা দিয়ে কমিটি করে দেই যাতে হ্যাচারিগুলো উন্নত মানের হয়। আমাদের রপ্তানি আরও খুলে যায়।’

‘রপ্তানির সময় অবশ্যই আমাদের সব সময় সতর্ক থাকতে হবে, যে কোনো মতে কোনো রকম অভিযোগ যেন না আসে’- বলেন প্রধানমন্ত্রী।

সততার সঙ্গে ব্যবসা করেই মুনাফা অর্জন সম্ভব বলে মনে করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশেও বাজার বাড়ছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়ছে। একজন রিকশাওয়ালা আগে যে কামাই করতো, তাতে চালই কেবল কিনতে পারত, এখন আল্লাহর রহমতে তা আর নেই। এখন মাছ থেকে শুরু করে সবই কিনতে পারে, সেই সক্ষমতাটা তাদের আছে। দিনমজুরেরও সেই সক্ষমতাটা বৃদ্ধি পেয়েছে। কাজেই চাহিদাটাও বাড়ছে। মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ক্রয়ক্ষমতা যত বাড়বে, আমাদের নিজস্ব বাজারও তত সৃষ্টি হবে।’

‘আমাদের দেশে দারিদ্র্যের হার কমে গেছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে, মানুষ ভালো জিনিস খেতে চায়, তাদের খাদ্যের চাহিদাটা আমরা দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে করতে পারি।’

মাছে ফরমালিন দেয়ার প্রবণতা কমে এসেছে বলেও মনে করেন শেখ হাসিন। বলেন, ‘এক সময় ফরমালিক সম্পর্কে সবাই খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। আমরা কিন্তু ফরমালিন এর অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করেছি।  এ বিষয়ে আরও কাজ করে যাচ্ছি।’

ইলিশ রক্ষায় নানা চেষ্টার ফলে উৎপাদন বছরে এক লাখ টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে তিন লাখ ৮৭ হাজার টনে পৌঁছেছে বলেও জানান শেখ হাসিনা। ইলিশ রক্ষায় বৈশাখে এই মাছটি না খাওয়ার জন্য আবারও আহ্বান জানান তিনি।

চিংড়ি ও মৎস্য এবং মৎস্যজাত দ্রব্য রপ্তানিতে সরকার উপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাভার, চট্টগ্রাম এবং খুলনায় তিনটি সর্বাধুনিক মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাছাড়া চাষিদের রোগমুক্ত চিংড়ি পোনা সরবরাহের জন্য কক্সবাজার, সাতক্ষীরা, খুলনায় তিনটি ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কক্সবাজারে আরও একটি ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

উত্তরবঙ্গেও ভাল মাছ উৎপন্ন হচ্ছে জানিয়ে সেখানেও পরীক্ষার জন্য একটি এবং সিলেট অঞ্চলে আরও একটি টেস্টিং ল্যাব তৈরি করতে মন্ত্রণালয়কে তাগাদা দেন প্রধানমন্ত্রী। সেই সঙ্গে বৃহত্তর সিলেট, বিশেষ করে কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণার হাওর অঞ্চলে মাছ চাষ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হাওর অঞ্চলে আমরা যে ফসল ফলাতে যাই, প্রায়ই তো আগাম বন্যা হয় এবং ফসল নষ্ট হয়। মোট কথা, হাওর অঞ্চলগুলোতে আমাদের আসলে মৎস্য চাষের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ভেতরে যে খাদগুলো আছে, সেগুলো আমাদের কাটতে হবে, ড্রেজিং করতে হবে।’

কেবল মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, সেগুলো সংরক্ষণ করা এবং প্রক্রিয়াজাত করাও দরকার বলে মনে করেন শেখ হাসিনা। আর এই মাছ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ইংল্যান্ড, ইতালিতে পাঠানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। বলেন, ‘ইংল্যান্ডে মাছ এবং ভাত খুবই জনপ্রিয়, বিদেশিদের কাছেও জনপ্রিয়। তারা সপ্তাহে একদিন যদি ভাত ও তরকারি না খায়, তাহলে তাদের পেট ভরে না। ’

যেসব মাছের চাহিদা বেশি, সেগুলো নিয়ে গবেষণারও তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘মহাশোল মাছও এক সময় কেবল পাহাড়ি অঞ্চলে পাওয়া যেত। সেটাও আমরা গবেষণা করে উৎপাদন করছি। সিলেটের মানুষ বোয়াল মাছ খেতে খুব পছন্দ করে। এটার ওপর কোনো গবেষণা এখনও হয়নি। এটার ওপরও গবেষণা দরকার।’

‘কোনটার বাজারে চাহিদা বেশি, সেটার ওপর গবেষণা করা, উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানি করা। এটার ওপর আমাদের জোর দিতে হবে। ’

‘আশা করি, মাছে, ভাতে বাঙালি-এটা যেন আমরা বজায় রাখতে পারি, সে জন্য আরও কাজ আপনারা করবেন’-মৎস্য বিভাগের কর্মীদেরকে বলেন প্রধানমন্ত্রী।

‘অনেক ধরনের মাছ কিন্তু আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় মাছগুলো, যেগুলো বিপন্ন প্রায় সেগুলো সংগ্রহ করা এবং প্রজনন করে বংশ বিস্তারের জন্য আপনারা দৃষ্টি দেবেন। ’