হাওরে হাহাকার!

মঞ্জুরুল আলম পান্না :

ভোলানিউজ.কম,

২৪-৪-২০১৭ইং সোমবার,

হাহাকার হাওরকন্যা সুনামগঞ্জে। হা-হুতাশ মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ আর নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওরঞ্চল জুড়ে। খা খা করছে চার জেলার ২৫ লাখ কৃষকের বুক, আহাজারী লাখো মাছ চাষীর হৃদয়ে। অতিবৃষ্টি আর মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢল এখন কৃষকের চোখে। সারা বছরের স্বপ্ন আর দীর্ঘ শ্রমের পর প্রান্তিক মানুষগুলোকে ধান পাকার আগেই তা কাটতে হয় অথবা পচা ধান কেটেও তা মাড়াই করতে হয় কতখানি কষ্ট নিয়ে সবশেষে কিছু একটা পাবার আশায়, আমরা তার কতটুকুই বা উপলব্ধি করতে পারি!
শুধু সুনামগঞ্জেই এবার প্রায় ষাট কোটি টাকা ব্যয়ে প্রধান ৪২টি হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ আর সংস্কারের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ফেব্রুয়ারির মধ্যে আর কিছু অংশ মার্চের শেষে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয় কাজের মাত্র চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ ভাগ। লুটপাটে ব্যস্ত থাকার কারণে মধ্য ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরুর কথা থাকলেও তা শুরু হয় ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকে। প্রথম থেকেই কৃষকসহ এলাকার সব মানুষের আশঙ্কা ছিল এবারের অকাল বন্যায় তাদের সব শেষ হতে চলেছে। হলোও তাই। এমনটা যে হবে সে তো হিসেবের কথা। নভেম্বর থেকে বোরো ধানের আবাদ শুরু হয়ে সে ফসল ঘরে ওঠে মধ্য এপ্রিলে। সব যখন শেষ হয়ে গেল, ঢাক ঢোল পিটিয়ে তখন পানি উন্নয়ন বোর্ড আর ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে দুদকের কর্তাব্যক্তিরা চষে বেড়াচ্ছেন দুর্নীতির তদন্তে। রোগীর মৃত্যুর পর ডাক্তার এসে আর লাভ কী? প্রতিবছরই যে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ আর সংস্কারের নামে সেখানে কোটি কোটি টাকা চুরি হয়, তা কি নতুন কিছু?
শুধু দুদক কেন, অকাল বন্যায় হাওরের মানুষগুলো ভেসে যাওয়ার পর রাজনীতির মাঠও ভেসে যাচ্ছে মায়াকান্নায়। দুর্গত মানুষগুলোকে নিয়ে পরস্পর বিরোধী রাজনীতি শুরু করেছে প্রধান দুই শাসকদল আওয়ামী লীগ-বিএনপি। সবসময় ঢালাওভাবে সরকারকে দোষ দেওয়াটা অবশ্য মূর্খতার পরিচয়। ফসল রক্ষা বাঁধের জন্য সব সরকারই কম-বেশি বরাদ্দ রেখে আসছে প্রতিবছর। বরং উত্তরোত্তর বাড়ছে বরাদ্দের পরিমাণ। কিন্তু কাজের নামে সামান্য কিছু করে সেই টাকা লুটেপুটে খায় সরকারি কর্তাব্যক্তি আর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। বছর বছর বরাদ্দ থাকলেও নেই সমন্বিত পরিকল্পনা। কোনো সঙ্কটেরই এই শাসক গোষ্ঠী কখনো স্থায়ী সমাধানের কথা বলে না। পুকুর চুরির গল্প নিশ্চয় জানা আছে সবার। সমস্যার স্থায়ী সমাধান হলে চুরির সুযোগ মিলবে কোত্থেকে? তিন দশকেরও বেশি সময় সুরমা, কালনী, মহাসিংহ-সহ এই অঞ্চলের নদীগুলোতে করা হয়নি কোনো খনন কাজ। পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি বহন করার মতো ক্ষমতা নেই নদীগুলোর বুকে।
২০০১ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত আট আটবারের মতো ঘরে ফসল তুলতে পারলেন না কৃষক। তবে এবারের ক্ষতি অবর্ণনীয়। যে কথা স্বয়ং রাষ্ট্রপতিও বলেছেন। সর্বস্ব খুইয়ে হাওরাঞ্চলে এখন মঙ্গার আশঙ্কা। সুনামগঞ্জের ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদকৃত বোরোর ৮২ শতাংশ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা প্রশাসন বললেও কৃষকেরা বলছেন ৯০ শতাংশের কথা। ফসলহানি না ঘটলে এবার উৎপাদিত ধান থেকে প্রায় ৯ লাখ মেট্রিক টন চাল পাওয়া হতো। মুষ্টিমেয় কিছু দুর্নীতিবাজের পাপ গ্রাস করেছে লাখ লাখ মানুষের ভবিষ্যতকে। এক ফসলী ছোট-বড় দেড়শোরও বেশি হাওর তলিয়ে যাওয়ার পর এখন মোড়ক লাগতে শুরু করেছে মাছসহ জলজ প্রাণীতে। গবাদি পশুর বেঁচে থাকার জন্যও নেই কোনো খাবারের ব্যবস্থা। ভিটেমাটি ছাড়তে শুরু করেছেন অনেকে।
এই অবস্থায় বিপর্যস্ত কৃষককে বাঁচাতে অবশ্যই তার কৃষিঋণ মওকুফ করতে হবে, নতুন করে সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, বিনামূল্যে সার-বীজ-কীটনাশক-তেলসহ কৃষি উপকরণ বিতরণের উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে কম দামে খোলা বাজারে চাল বিক্রি চলছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। নতুন ফসল না ওঠা পর্যন্ত নিঃস্ব কৃষকদের জন্য ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে চাল দেওয়ার যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, সেখানেও যেন কোনো প্রকার দুর্নীতি না হয় তাতে কড়া নজরদারি রাখতে হবে। কারণ ভিজিএফ কার্ড নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। সবচেয়ে বড় কথা খরায় মরুকরণ আর বর্ষায় অতি বন্যা থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে থাকা অভিন্ন নদ-নদীগুলোর পানি বণ্টন সমস্যার সমাধান দ্রুত না করে আর উপায় নেই। আর দুদক কী করে, তাও আমরা দেখতে চাই। কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নিতে পারলে ভারত প্রকৃতির ভয়াবহতাকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ বারবারই ভয়ঙ্কর হয়ে উপস্থিত হবে।
তাছাড়া এই তদন্তে কিছু হবে বলেও মনে হয় না। পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ রোববার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘বাঁধের চেয়ে পানির উচ্চতা বেশি হওয়ায় হাওর এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। হাওর বাঁধ নির্মাণে কোনো দুর্নীতি হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ অতি প্লাবনের কারণ তো মাননীয় মন্ত্রী আগেভাগে বলেই দিলেন। বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির তদন্ত করে আর লাভ কী! এদিকে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠেছে সুনামগঞ্জকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করার। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি আর জটিলতায় মানবিকতাও বোধহয় উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যায়। আমলাতন্ত্রের উৎকৃষ্ট মানসিকতার পরিচয় আবারও নতুন করে পেলাম বিপর্যস্ত হাওরের মানুষকে কেন্দ্র করে। ওই অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবির প্রেক্ষিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিবের মন্তব্য, ‘সুনামগঞ্জকে যারা দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন তাদের কোনো জ্ঞানই নেই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২-এর ২২ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো এলাকার অর্ধেকের উপরে জনসংখ্যা মরে যাওয়ার পর ওই এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হয়।’ তাই সুনামগঞ্জকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হলে না কি এখানকার অর্ধেক মানুষকে মরতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, ওই আইনের কোথাও এমন কথার উল্লেখ নেই। নিজ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর আইনের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে একজন সচিবের তামাশারও শিকার হতে হয় অসহায় নিঃস্ব মানুষগুলোকে। নেই কোনো জবাবদিহিতা। এ এক বড় অদ্ভূত দেশ। জবাবদিহিতা আসলে কোথায় রয়েছে, সেটিও এক বড় প্রশ্ন।